কখনো কখনো আল্লাহ আমাদের ভেঙে দেন, যেন আমরা তাঁর দিকে ফিরে আসি
জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন মনে হয়, একসঙ্গে এতগুলো সমস্যা কেন আমার জীবনেই আসছে? একটা সমস্যা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা সমস্যা সামনে এসে দাঁড়ায়। কখনো নিজের অসুস্থতা, কখনো পরিবারের অসুস্থতা, কখনো অর্থের চিন্তা, কখনো সম্পর্কের কষ্ট, সবকিছু মিলিয়ে মানুষ ভেতর থেকে ক্লান্ত হয়ে যায়। তখন মনে একটা প্রশ্ন আসতেই পারে **“আল্লাহ, আর কত?
এই প্রশ্নটা দুর্বলতার নয়। মানুষ হিসেবে কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। চোখে পানি আসা স্বাভাবিক। মন ভেঙে যাওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু একজন মুমিনের সৌন্দর্য হলো, কষ্টের মাঝেও সে আল্লাহকে ছেড়ে দেয় না। আল্লাহ কুরআনে বলেন, “নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।” খেয়াল করুন, আল্লাহ বলেননি যে জীবনে কোনো কষ্ট আসবে না। বরং তিনি আমাদের জানিয়েছেন, কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি রয়েছে।
অর্থাৎ আজ যে পরিস্থিতিটাকে আমরা শেষ মনে করছি, সেটাই হয়তো আমাদের জীবনের নতুন কোনো দরজার শুরু। আমরা অনেক সময় চাই আল্লাহ আমাদের সমস্যা যেন সঙ্গে সঙ্গে দূর করে দেন। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা আমাদের পরিকল্পনার মতো নয়। কখনো তিনি সমস্যা সরিয়ে দেন, কখনো সমস্যার মধ্যেই আমাদের শক্ত করেন, কখনো কোনো বিপদের মাধ্যমে আমাদের ভুল থেকে ফিরিয়ে আনেন, আবার কখনো এমন কিছু থেকে দূরে রাখেন যার ক্ষতি আমরা তখন বুঝতেই পারি না।
তাই প্রতিটি কষ্টকে শুধু শাস্তি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ বলেছেন, একজন মুমিনের ব্যাপার আশ্চর্যজনক, তার আনন্দের সময় সে শুকরিয়া আদায় করলে সেটিও তার জন্য কল্যাণকর, আর বিপদে পড়ে ধৈর্য ধরলেও সেটি তার জন্য কল্যাণকর। অর্থাৎ একজন মুমিনের জীবনে সুখও শিক্ষা, দুঃখও শিক্ষা। সুখের সময় সে যেন অহংকারী না হয়। আর কষ্টের সময় যেন আল্লাহর প্রতি হতাশ না হয়।
কখনো আমরা এমন পরিস্থিতিতে পড়ি, যেখানে মনে হয় আমাদের পাশে কেউ নেই। যাদের কাছ থেকে সহযোগিতা আশা করেছিলাম, তারাই হয়তো পাশে নেই। যাদের নিজের মানুষ মনে করেছিলাম, তারাই হয়তো কষ্ট দিয়েছে। সেই সময় একটা কথা মনে রাখা খুব জরুরি, মানুষের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর দরজা বন্ধ হয় না। মানুষ আপনার ফোন ধরবে না, কিন্তু আল্লাহ আপনার দোয়া শুনছেন। মানুষ আপনার কষ্ট বুঝবে না, কিন্তু আল্লাহ আপনার অন্তরের কথাও জানেন।
মানুষ আপনার চোখের পানি দেখতে পাবে না, কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কান্নাই অদৃশ্য নয়। তাই কষ্টের সময় মানুষের কাছে নিজের মূল্য প্রমাণ করার চেয়ে আল্লাহর কাছে নিজের অবস্থাটা তুলে ধরা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে দুই রাকাত নামাজ পড়ে শুধু বলুন, “হে আল্লাহ, আমি জানি না কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে বের হব। কিন্তু আপনি জানেন। আমি জানি না সামনে কী আছে। কিন্তু আপনি জানেন। তাই আমি আমার বিষয়টা আপনার ওপর ছেড়ে দিলাম।”
হয়তো সমস্যাটা সঙ্গে সঙ্গে চলে যাবে না। কিন্তু আপনার অন্তরটা শান্ত হতে শুরু করবে। আর অনেক সময় বাইরের পরিস্থিতি পরিবর্তন হওয়ার আগে আল্লাহ আমাদের ভেতরটা পরিবর্তন করে দেন। আরেকটি বিষয়, কষ্টের সময় নিজেকে একেবারে অসহায় ভাববেন না। আল্লাহ বলেন, তিনি কোনো আত্মার ওপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আমাদের কোনো কষ্ট হবে না। বরং এর অর্থ হলো, আল্লাহর জ্ঞান ও হিকমাহর বাইরে আমাদের ওপর কিছুই আসে না। তাই যখন জীবন কঠিন হয়ে যায়, তখন নিজেকে বলুন, “আমি হয়তো দুর্বল হয়ে গেছি, কিন্তু আমার রব দুর্বল নন।” আমি হয়তো পথ দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু আল্লাহ পথ জানেন। আমি হয়তো ভবিষ্যৎ বুঝতে পারছি না, কিন্তু আল্লাহ ভবিষ্যৎ জানেন।
আমি হয়তো আজ শুধু অন্ধকার দেখছি, কিন্তু আল্লাহ জানেন কোথায় আলো রয়েছে। কষ্টের সময় আরেকটি ভুল আমরা করি, বারবার অতীত নিয়ে ভাবি। “যদি ওই সিদ্ধান্তটা না নিতাম, যদি ওই মানুষটাকে বিশ্বাস না করতাম, যদি তখন অন্যভাবে করতাম, এভাবে নিজের মনকে আরও ভেঙে ফেলি।
রাসুলুল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন, কোনো বিপদ এসে গেলে শুধু “যদি আমি এমন করতাম, এভাবে পড়ে না থেকে আল্লাহর তাকদিরের ওপর ভরসা করতে এবং উপকারী বিষয়ের চেষ্টা করতে। অতীত থেকে শিক্ষা নিন, কিন্তু অতীতে বাস করবেন না। যেটা হয়ে গেছে, সেটা আর ফিরবে না। আজ আপনার হাতে যে সময়টা আছে, সেটাই আপনার আসল সুযোগ। তাই আজ যদি কষ্টে থাকেন, নামাজ ছেড়ে দেবেন না। দোয়া ছেড়ে দেবেন না। কুরআন ছেড়ে দেবেন না। আল্লাহর ওপর ভরসা ছেড়ে দেবেন না।
আর নিজের সমস্যার সমাধানের জন্য বাস্তব চেষ্টা করাও ছেড়ে দেবেন না। চিকিৎসা দরকার হলে চিকিৎসা নিন, কারও সাহায্য দরকার হলে বিশ্বস্ত মানুষের সাহায্য নিন, আর্থিক সমস্যা হলে পরিকল্পনা করুন। তাওয়াক্কুল মানে বসে থাকা নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের সাধ্যের মধ্যে চেষ্টা করা।
সবশেষে একটা কথা খুব মনে রাখবেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন, একজন মুমিনের ওপর যে কষ্ট, দুঃখ, অসুস্থতা কিংবা মানসিক উদ্বেগ আসে, এমনকি কাঁটার আঘাতও আল্লাহ এর মাধ্যমে তার কিছু গুনাহ মোচন করেন। তাহলে আজকের আপনার কান্না হয়তো শুধু কান্না নয়। আজকের আপনার ধৈর্য হয়তো শুধু ধৈর্য নয়।
আজকের আপনার অসহায়ত্ব হয়তো আপনাকে এমন একটি অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে আপনি আগের চেয়ে আরও বেশি আল্লাহর কাছে ফিরে যাবেন। হয়তো একদিন পেছনে ফিরে তাকিয়ে বলবেন, “তখন বুঝিনি কেন এত কষ্ট এসেছিল। আজ বুঝতে পারছি, আল্লাহ আমাকে ভেঙে দেননি; তিনি আমাকে তাঁর আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন।”
তাই এখন যত কঠিন সময়ই হোক, হাল ছাড়বেন না। সিজদায় যান। দোয়া করুন। কাঁদুন। আবার উঠে দাঁড়ান। চেষ্টা করুন। আর মনে রাখুন, যে রব আপনাকে এতদিন পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন, তিনি আপনাকে এখানেও একা ছেড়ে দেবেন না। আল্লাহ আমাদের সব বিপদ সহজ করে দিন, অসুস্থদের সুস্থতা দিন, দুশ্চিন্তাগ্রস্তদের অন্তরে শান্তি দিন, ঋণগ্রস্তদের স্বচ্ছলতা দিন এবং আমাদের প্রত্যেককে কঠিন সময়ে ধৈর্য ও ঈমানের সঙ্গে থাকার তাওফিক দিন।আমিন।
আমি আল সারজিল ইসলাম সিয়াম। আমি বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। আমি বর্তমানে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিএসসি-র ছাত্র। আমি স্বতন্ত্র স্বাধীনতা সমর্থন করি। আমি বই পড়তে এবং কবিতা লিখতে পছন্দ করি। আমি নিজের মতামত প্রকাশ করার এবং অন্যের মতামত মূল্যায়ন করার চেষ্টা করি। আমি অনেক ভ্রমণ পছন্দ করি। আমি আমার অতিরিক্ত সময় ভ্রমণ করি এবং নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে ভালোবাসি। নতুন মানুষের সংস্কৃতি এবং তাদের জীবন চলার যে ধরন সেটি পর্যবেক্ষণ করতে ভালোবাসি। আমি সব সময় নতুন কিছু জানার চেষ্টা করে যখনই কোনো কিছু নতুন কিছু দেখতে পাই সেটার উপরে আকর্ষণটি আমার বেশি থাকে।
বিষয়: কখনো কখনো আল্লাহ আমাদের ভেঙে দেন, যেন আমরা তাঁর দিকে ফিরে আসি
কমিউনিটি : সাহিত্য ক্যানভাস
আন্তরিক ভাবে ধন্যবাদ জানাই এই কমিউনিটির সকল সদস্য কে, ধন্যবাদ...



High-Yield Curation by @steem-seven
Your content has been supported!
Maximize your passive income!
Delegate your SP to us and earn high rewards
Click here to see our Tiered Reward System
We are the hope!