রাত তিনটায় মায়ের ফোন
চাকরির ইন্টারভিউ দিতে ঢাকায় এসেছিল ইমরান। ট্রেন লেট করায় রাত সাড়ে তিনটায় স্টেশনে নামল। ইন্টারভিউ সকাল দশটায়, আর শহরে থাকার কোনো জায়গা নেই। মামার বাসায় যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এই রাতে ফোন ধরছেন না কেউ।
বাধ্য হয়ে স্টেশনের কাছেই একটা সস্তা হোটেলে উঠল। রুমে ঢুকে ব্যাগ রেখে একটু গা এলিয়ে দিল বিছানায়। জার্নির ক্লান্তিতে চোখ লেগে এল।
কিছুক্ষণ পর দরজায় নক। ইমরান ভাবল হয়তো হোটেলের লোক কিছু বলতে এসেছে। দরজা খুলতেই দেখল, এক অপরিচিত নারী দাঁড়িয়ে, বলল ম্যানেজার পাঠিয়েছে।
মুহূর্তেই বুঝে গেল, এটা কোনো সাধারণ হোটেল নয়। ভেতরে ভয় আর অস্বস্তি একসাথে জেঁকে বসল।
"লাগবে না, আপনি যান"—বলে দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করল ইমরান। কিন্তু মেয়েটি নাছোড়। কথায় কথায় বোঝাতে চাইল, "একদম চিন্তার কিছু নেই, কেউ জানবে না।"
ইমরানের মাথায় তখন হাজারো চিন্তা—একা শহরে, রাতের অন্ধকার, চেনা কেউ নেই, নিজের সাথে লড়াই করছে মন। ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ছিল সে।
ঠিক তখনই পকেটে মোবাইল বেজে উঠল। মা ফোন করেছেন।
"বাবা, ঠিকমতো পৌঁছেছিস তো? আমার ঘুম আসছিল না, তাই ফোন দিলাম।"
ইমরানের গলা কেঁপে উঠল। "হ্যাঁ মা, ঠিক আছি। তুমি ঘুমাও, চিন্তা কোরো না।"
ফোন কেটে দেওয়ার পর ইমরান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মায়ের গলার আওয়াজ যেন তাকে হঠাৎ জাগিয়ে দিল। এই মা—যিনি রাত জেগে ছেলের জন্য দুশ্চিন্তা করেন, যিনি সারাজীবন কষ্ট করে তাকে বড় করেছেন—তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মুহূর্তের লজ্জাটা যেন সে সরাসরি দেখতে পাচ্ছেন।
ইমরান দরজার দিকে ফিরে দৃঢ় গলায় বলল, "আপনি চলে যান। আমার কিছু লাগবে না।" এবার আর দ্বিধা করল না। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সেই মুহূর্তেই রুম থেকে বেরিয়ে এল, রিসেপশনে টাকা মিটিয়ে হোটেল ছেড়ে রাস্তায় নেমে এল।
বাইরে তখনও অন্ধকার কাটেনি। কাছেই একটা চায়ের দোকান খোলা ছিল, সেখানে বসে এক কাপ চা নিল। পাশেই এক মা তার ছোট্ট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন, হয়তো ফুটপাতেই থাকেন। অভাবের মধ্যেও কী মমতায় বাচ্চাটাকে জড়িয়ে রেখেছেন।
ইমরানের চোখ ভিজে এল। মনে মনে ভাবল—প্রতিটা মায়ের একটাই চাওয়া, সন্তান যেন মানুষের মতো মানুষ হয়। আর সেই চাওয়াটা পূরণ করার দায়িত্ব সন্তানেরই, বিশেষ করে এমন মুহূর্তে যখন কেউ দেখছে না, কেউ জানবে না।
আস্তে আস্তে পূর্ব আকাশে আলো ফুটতে শুরু করল। নতুন একটা দিনের শুরু—কিন্তু ইমরানের কাছে এটা শুধু আরেকটা দিন নয়, নিজের সাথে একটা লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার দিন।
সকাল দশটায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ইমরান খেয়াল করল, রাতের সেই মুহূর্তটার পর তার মনে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে। ইন্টারভিউ ভালো হলো, চাকরিও হয়ে গেল কিছুদিন পর। কিন্তু ইমরান সবসময় বলে, সেই রাতে চাকরির চেয়েও বড় একটা জয় সে পেয়েছিল।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, শয়তান মানুষকে পাপের পথে ডাকে আর অভাবের ভয় দেখায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন।
জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন কেউ দেখছে না, কেউ জানবে না—ঠিক তখনই বোঝা যায় মানুষের প্রকৃত চরিত্র। আল্লাহ সবসময় দেখছেন, এই বিশ্বাসটাই একজন মানুষকে সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তেও সঠিক পথে রাখতে পারে।
যাদের মা এখনও বেঁচে আছেন, তাদের দুআ আর ভালোবাসাই হয়তো আমাদের অনেক বিপদ থেকে আড়াল করে রাখে, যা আমরা কখনো জানতেও পারি না।




