আহারে জীবন

কিছুদিন আগে মধ‍্যবয়স্ক এক দম্পতি এসেছিলেন আমার চেম্বারে ।

Couple_consulting_a_doctor_2K_202609062328.jpeg

রোগীর বয়স ৪১ বছর আর রোগীর হাজবেন্ডের বয়স ৪৮ কিংবা ৪৯ বছর ।

তাঁরা বাচ্চা নিতে চান ।

এই বয়সে এমন কথা শুনে আমি অবাক হয়ে উনাদের দিকে তাকালাম।

ভেবেছিলাম হয়তো দ্বিতীয় বিয়ে বা এমন কিছু একটা। কিন্তু না .. তাদের সমস্যা অন্য জায়গায়।

সমস্যা বলার আগে রোগী এবং রোগীর হাজবেন্ডের শারিরিক অবস্থা পরিষ্কার করি ।

রোগীর হাইপারটেনশন, ডায়বেটিস দুটোই আছে । নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়।

রোগীর হাজবেন্ডের হাইপারটেনশন, ডায়বেটিস এবং পিলআইডি আছে । অতি সম্প্রতি তাকে নাকি ডাক্তার চর্বির ওষুধও খেতে দিয়েছেন ।

স্বামী - স্ত্রীর এই শারীরিক অবস্থায় এবং এই বয়সে কেন তারা বাচ্চা নিতে চান জানতে আগ্রহী হলাম ।

হিস্ট্রি নিতে গিয়ে জানলাম তাদের দুইজন সন্তান ছিল ।

ছিল শব্দটা বলাতে আমি আতকে উঠলাম । তাহলে কি অ‍্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে নাকি ? প্রশ্ন করতে সাহসে কুলালো না ।

তবুও চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকলাম দুজনের দিকে ।

রোগীর হাজবেন্ড নিজে থেকেই বললেন - কি আর বলব ম‍্যাডাম …

অনেক স্বপ্ন ছিলো ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে । ইচ্ছা ছিল মেয়েকে ডাক্তার বানাব । এমন কোন আব্দার বা চাহিদা নাই যেটা আমি পূরণ করি নাই মেয়ের জন্য । কিন্তু সেই মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার পর একটা ছেলের সাথে ভেগে গেল ।

আমি আর কোনদিন ওই মেয়ের চেহারাও দেখতে চাই না । ত‍্যাজ‍্য করে দিছি ওকে ।

চোখে টলমল অশ্রু প্রাণপণে আটকে রাখার চেষ্টা টাও আমার চোখে পড়লো । দেখলাম একজন বাবার মেয়ের জন‍্য কী নিষ্ফল আকুতি !

আহা মেয়ে … তুমি যদি বুঝতে …

আমি তবুও জানার চেষ্ট করলাম - সেই মেয়ে কেমন আছে ? সুখী হয়েছে ?

বাবার চোখে আগুন জ্বলে উঠতে দেখলাম । মুখ শক্ত করে বললেন - আমি কখনো জানার চেষ্টাও করি নাই । ঐ মেয়ে আমার কাছে মৃত !

আমার রোগী ওদিকে কেঁদেই যাচ্ছেন ।

জানতে চাইলাম - আর ছেলেটা কোথায় ?

রোগী কান্নার দমকে কথাই বলতে পারছেন না । আমি তার একটা হাত ধরলাম শুধু ।

রোগীর স্বামী নিজেই বললেন - ছেলেটা চাকরি পাওয়ার পরের মাসেই নিজেই পছন্দ করে বিয়ে করে আনলো । মেয়েকে হারিয়ে ছেলেকে আর হারাতে চাইনি । আমরা চুপচাপ মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু ছেলে আর ছেলের বৌ দুজনের কেউই আমাদের সাথে থাকতে চায়নি ।

বিয়ের তিন মাসের মাথায় আলাদা বাসা নিয়ে চলে গেছে । আমাদের কোন খোঁজও নেয় না ।

বিশ্বাস করেন ম্যাডাম , ছেলের রোজগারের একটা টাকাও আমরা কখনো খাইনি !

মনে হলো আমি একটা ঘোরের মধ্যে আছি। আহা সন্তান..! এদের জন্য আমাদের এত কষ্ট.. এত স্বপ্ন .. এত আদর …

কিন্তু ওরা বুঝে না কেন ….?

Elderly_couple_sitting_on_sofa_2K_202609062328.jpeg

কখন যেন নিজের চোখ থেকেও দু ফোঁটা অশ্রু ঝরেছে টের পাইনি ।

চোখ মোছার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করেই আমি বললাম- ধরেন , আপনার বাচ্চা হলো । সেই বাচ্চা মানুষ করতে করতে আপনাদের বয়স শেষ । যদি মরে না যান তবুও কথা থেকে যায় - এইটাও বড় হয়ে ঠিক আগের দুজনের মতো করবে না তার গ‍্যারান্টি কি ?

স্বামী - স্ত্রী দুজনেই আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন । সেই দৃষ্টিতে ছিলো এক রাশ শূন্যতা আর বিষাদের নীল কষ্ট !

স্বাস্থ্য ঝুঁকি বুঝানোর পরও তারা বাচ্চা নেবার চেষ্টা করতে চান । তাদের কথা বলারও মানুষ নাই । বাচ্চার কামাই রোজগার খেতে নয় .. বরং শেষ বয়সে শুধুমাত্র কথা বলার জন্য একটা বাচ্চা লাগবে তাদের ।

স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলেও যে বড্ড একা !

স্বামী - স্ত্রী দুজনেরই কিছু রুটিন পরীক্ষা দিয়ে রিপোর্ট নিয়ে দেখা করতে বলে উনাদের বিদায় দিলাম ।

Doctor_sitting_thoughtfully_at_desk_2K_202609062328.jpeg

বিষাদে ছেয়ে আছে মনটা । বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস আসলো আমার ।

যেটার মানে - আহারে.. জীবন ..😞!

🖋️ লেখনিতে: ডা. জাহান সুলতানা