প্রায় বোঝা যাওয়া — কেন চেষ্টা করাটা কখনও কখনও ব্যবধান বাড়িয়ে দেয়
খেয়াল করি এখন — কখন একজন মানুষ বুঝে ফেলে যে আমি তার কথা ধরতে পারিনি। ব্যাপারটা খুব নিঃশব্দে ঘটে। প্রায় ভদ্রতার মতো। চোখে একটা ছোট নড়াচড়া, তারপর গলাটা বদলে যায় — সেই সুর, যেটা মানুষ তখনই ব্যবহার করে যখন আর কিছু আশা থাকে না, কিন্তু কথা থামায়ও না। কারণ কথাগুলো অর্ধেক বেরিয়ে গেছে, রাখার জায়গা কোথায়।
প্রায় বোঝা হয়ে যাওয়ার মধ্যে একটা আলাদা রকমের একাকীত্ব আছে। একদম না-বোঝার চেয়ে বেশি খারাপ, মনে হয় আমার। কেউ যখন একটু কাছাকাছি থাকে — সঠিক শব্দটার কাছে পৌঁছে আবারও হাত ফসকে যায় — তখন দাঁড়িয়ে থাকার মতো লাগে একটা সরু নদীর দুই পাড়ে। দুজন দুজনকে স্পষ্ট দেখতে পায়। শুধু পার হওয়া যায় না।
ছোটবেলায় আম্মু আমাকে একটা কথা বলেছিলেন নিজের সম্পর্কে, যেটা তিনি নিজের মায়ের কাছে কখনো বলেননি। বলেছিলেন এই ভেবে যে আমি হয়তো বুঝব। আমি শুনেছিলাম, মাথা নেড়েছিলাম, একটা প্রশ্ন করেছিলাম যেটা ঠিক মনে হয়েছিল আমার। কিন্তু কথা বলার সময় ওনার মুখ দেখছিলাম। দেখেছিলাম ঠিক কোন মুহূর্তে ওনার ভেতরে কথাটা শেষ হয়ে গেল। উনি হেসে বললেন, "ঠিক আছে, কিছু বলতে হবে না।" চোখ তখন আগেই অন্য কোথাও চলে গেছে।
তখন শেখা উচিত ছিল। শিখিনি। বছরের পর বছর বিশ্বাস করেছি — দুজনের মাঝের ফাঁকটা বন্ধ করা যায়, যদি আমি যথেষ্ট চেষ্টা করি। যথেষ্ট মন দিই। যথেষ্ট প্রশ্ন করি। যেটা বুঝিনি সেটা হলো — চেষ্টাটাই মাঝে মাঝে ফাঁকটা আরও বাড়ায়। অন্য মানুষটা টের পায় তুমি হাত বাড়াচ্ছ। আর সেই হাত বাড়ানোই প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায় যে দূরত্বটা আছে, সেটাকে মাপতেই হচ্ছে।
প্রতিটা ভুল বোঝাবুঝির ভেতরে একটা মুহূর্ত আসে যখন ব্যাপারটা জমাট বেঁধে যায়। তার আগে বাতাসে দুটো অর্থই ঝুলতে থাকে — তোমারটা, আর ওরটা — পাশাপাশি, প্রায় ছুঁয়ে। তারপর কিছু একটা বদলায়। জোরে না, নাটকীয় না। একটা ছোট্ট ভার থিতু হয়। দুই অর্থ আলাদা হয়ে যায়, আর প্রত্যেকে নিজেরটুকু বুকে নিয়ে চলে আসে। ঠিক কখন বদলটা ঘটে আমি জানি না। শুধু পরে টের পাই — যেমন ঘরের নিস্তব্ধতা টের পাই, ঘড়িটা কখন থেমেছে মনে থাকে না।
সবচেয়ে খারাপ হলো — আমি দুপাশেই ছিলাম। আমিও ব্যাখ্যা করা বন্ধ করে দিয়েছি। কাউকে আমার দিকে হাত বাড়াতে দেখে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। ওরা ভুল ছিল বলে না, নিষ্ঠুর ছিল বলে না। শুধু চেষ্টাটা এত প্রকট ছিল। মনে হতো আমাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে, আমাকে ঠিকভাবে ধরার চেষ্টা চলছে। কাউকে ঠিকভাবে ধরা মানে তাকে ভালোবাসা না। একটুও না। জানি, কারণ আমি নিজেই এমন করেছি যাদের ভালোবাসি তাদের সাথে।
মনে হয় মাঝে মাঝে — ভুল বোঝাবুঝিই দুজনের মধ্যে সবচেয়ে কাছের জিনিস। এটা তখনই ঘটে যখন তুমি কথা বলার মতো করে কাউকে কাছে মানো। অচেনা মানুষ ভুল বোঝে না — তাদের কাছে পড়ার কিছু থাকে না। কিন্তু কাছের মানুষ, যারা তোমার চুপ থাকাটা চেনে, তারাই এমন একটা অর্থ শুনে ফেলে যেটা তুমি বলতেই চাওনি। আর এটাও কি অদ্ভুত এক কাছাকাছি হওয়া না? এতটা চেনা যে ভুল শোনা যায়। কিন্তু আমি জানি না। হয়তো শুধু সান্ত্বনা খুঁজছি। রাত অনেক হয়েছে, আর কোনটা সান্ত্বনা আর কোনটা সত্যি সেটা আলাদা করার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছি।
মনে আছে — যার সাথে শেষবার কথা হয়েছিল, বোঝার আগেই বুঝে গিয়েছিলাম আমরা কখনো এক ভাষায় কথা বলিনি। মুখোমুখি বসে ছিলাম। আমি একটা কথা বললাম যা মাসের পর মাস বুকে ছিল। খুব যত্ন করে বললাম, যেভাবে ভাঙা জিনিস হাতে নিতে হয়। শেষ করলাম। একটু থামা। তারপর ও বলল, "তুমি আসলে যা বলতে চাইছ—" আর ও বাকিটা নিজে থেকে ভরে দিল। ও খুব নরম ছিল। এই ব্যাপারটাই মেলাতে পারি না। ও এত নরম ছিল, এত নিশ্চিত ছিল, আর আমি যা বলেছিলাম তার থেকে এত দূরে ছিল। শুধরে দিতে ইচ্ছে করল। মুখ খুললাম শুধরে দেব বলে। কিন্তু মনে হলো শুধরানো বৃথা — এমন কাউকে কবিতা অনুবাদ করে শোনানোর মতো, যে আগে থেকেই জানে কবিতাটা কী বোঝায়।
মনে হয় তখনই ফাঁকটা বন্ধ করার চেষ্টা ছেড়ে দিলাম। তিক্ততায় না। বরং এক অদ্ভুত মমতায়। কিছু মানুষ আছে, তারা শুধু নদীর ধারে এসে দাঁড়াতে পারে। আর হয়তো সেটুকুই যথেষ্ট। হয়তো চেষ্টাটাই — ওর চেষ্টা, আমার চেষ্টা — স্রেফ চেষ্টাটাই আমাদের একমাত্র সেতু। বোঝাপড়াটা না। শুধু হাত বাড়ানোটা, এগিয়ে আসাটা, প্রায়-ছোঁয়াটা। প্রায়-ছোঁয়াটা মাঝে মাঝে এত বেশি হয়ে যায় যে আমি আশাও করি না।
কী করব জানি না। টেবিলে একটা গ্লাস আছে পাশে। সবুজ, কিনারে একটা চিড় — মুখের কাছে গেলে মনে পড়ে। তবুও ওটা দিয়েই পানি খাই। ভেঙে ফেলতে পারি, কিন্তু ফেলব না। অনেক বছরের গ্লাস। চিড়টাই এখন পানির স্বাদের ভেতরে মিশে আছে।