কালীপূজার রঙ্গমঞ্চ: মানুষের কল্পনার আকাশছোঁয়া পান্ডেল
"আমি এই পান্ডেল তৈরি করতে পারি, কিন্তু এই রঙ্গমঞ্চে কালীমাকে দেখতে পারি না।" প্রথমবার এমন কথা শুনেছিলাম। কলকাতার পুরনো শহরের এক নামকরা পান্ডেল মেকারের কথা ছিল। তিনি তার রঙ্গমঞ্চের বাইরে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, যেখানে হাজার হাজার মানুষের ভিড় জমেছিল। তার কথা থেকেই বুঝতে পারলাম, এই পান্ডেল নয়, এর পেছনের কল্পনা ও আবেগই আসল সত্ত্ব।
প্রতি বছর শারদীয়া কালীপূজার সময় আমাদের শহরগুলো এমন রঙ্গমঞ্চে পরিণত হয়, যেখানে কালীমায়ের মূর্তি মাত্র একটি অংশ। সত্যি বলতে, পান্ডেলই আসল নায়ক, যা সবচেয়ে বেশি সময় নিয়ে তৈরি হয়। প্রতিটি পান্ডেল একটি গল্প বলে। কখনও হয় সেই গল্প সামাজিক, কখনও রাজনৈতিক, আবার কখনও হয় শুধুই শিল্পের কথা। একজন পান্ডেল মেকারের জীবন অনেক কঠিন। আমি জানি আমার এক প্রতিবেশী রাজু বাবু, যিনি সাত বছর ধরে কালীপূজার পান্ডেল তৈরি করেন। বছরের শুরুতেই তিনি ডিজাইন ঠিক করেন, আগস্ট মাস থেকে কাঠ কাটা, সেঁটে, কাটা শুরু হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি তার ছোট কর্মশালায় বসে থাকেন। বছরখানেক আগে দেখেছিলাম, তার হাতের আঙ্গুলের পর পর কাটা দাগ। জিজ্ঞেস করলে বলেন, "এই ক্ষতিগুলোই আমার কাজের প্রমাণ। প্রতিটি পান্ডেলে আমার রক্ত থাকে।"
পান্ডেল তৈরির প্রক্রিয়াটা অনেক জটিল। প্রথমে হয় ডিজাইন। বর্তমান প্রজন্মের অনেক পান্ডেল মেকার বাংলাদেশের প্রখ্যাত স্থপতি ফজলুর রেহমান খানের স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা নেন। তাদের পান্ডেলে দেখা যায় কোনো কোনো ঐতিহ্যবাহী বাংলার মন্দিরের স্থাপত্য উপাদান। তারপর আসে কাঠ বাছাই। সাধারণত শিশু, শাল বা গমার কাঠ ব্যবহার হয়। কাঠটি হতে হবে শক্ত এবং বছর খানেক ধরে শুকিয়ে থাকতে হবে। আমার একটি ভুল স্মরণ আছে। পূর্ববাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) আমরা একসময় ছোট ছোট পান্ডেল দিয়ে কালীপূজা পালন করতাম। একবার আমরা বিড়ম্বনাপুর নামক এক গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানকার মন্দিরে আমি একটি খুব সুন্দর পান্ডেল দেখেছিলাম। পরের বছর আমি ঠিক সেই ডিজাইন কপি করে আমার এলাকায় তৈরি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পান্ডেল তৈরি করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, সেখানে আসলেই কোনো ম্যাজিক নেই। শুধু কাঠ, কর্মী এবং অসংখ্য ঘন্টা পরিশ্রম। সেদিন আমি শিখেছিলাম, সৌন্দর্য তৈরি করা আসলে অনেক বেশি কঠিন এবং পরিশ্রমসাধ্য কাজ।
এই বছর কালীপূজা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে। বাংলাদেশে আমরা কয়েকটি নতুন পান্ডেল দেখতে পাচ্ছি, যেগুলো পরিবেশ বান্ধব উপাদান দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। দূর্ভাগ্যবশত এই ধারণা এখনও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েনি। সাধারণত পান্ডেল পূজার পরে বাতাসে ভেঙে যায় এবং নষ্ট হয়ে যায়, যা পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। কিছু সচেতন গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই পরিবেশ বান্ধব পান্ডেল তৈরি করছে, যা পরে পুনর্ব্যবহারযোগ্য হবে।
পান্ডেল তৈরির জগতে কখনও কোনো কল্পনার সীমা থাকে না। একদিকে যেখানে রয়েছে শত বছরের ঐতিহ্য, সেখানে অন্যদিকে দেখা যায় নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কিছু পান্ডেল মেকার বাংলাদেশের নদী, হাওয়া, প্রাণীজগত এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুর্দশার মতো সামাজিক বিষয়গুলোকে পান্ডেলে তুলে ধরেছেন। এটা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে মানুষ তার অনুভূতি প্রকাশ করে। প্রতি বছর কালীপূজা আসলে একটি নতুন শুরু। একজন পান্ডেল মেকারের জন্য, এটি একটি সম্পূর্ণ বছরের পরিকল্পনা এবং শ্রম। এই পান্ডেলের মধ্যেই আমরা দেখতে পাই কল্পনার শক্তি, শিল্পের বিকাশ এবং মানুষের মনের গভীরতা। প্রশ্ন হলো, এই উৎসবে আপনি কোন পান্ডেল দেখতে ভালোবাসেন এবং কেন? সামনের বছর কোন নতুন ধারণার পান্ডেল দেখতে চান?
Tags: #hive-129948 #steemexclusive #amarbanglablog #bangla #bengali #blog #creativewriting #club5050 এই পোস্টটি আ
