মায়ের পা ফোলা দেখে যা বুঝলাম
ঢাকার একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করত সোহেল। মাস শেষে বেতন পেয়ে নিজের শখ-আহ্লাদ মেটাতেই বেশিরভাগ টাকা খরচ হয়ে যেত—নতুন ফোন, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া। গ্রামে থাকা মা-বাবার জন্য মাসে হাজার দুয়েক টাকা পাঠিয়েই সে ভাবত দায়িত্ব শেষ।
একবার ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেল সোহেল। মা দরজা খুলে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। কথা বলতে বলতে সোহেল খেয়াল করল, মা হাঁটার সময় একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছেন।
"মা, পায়ে কী হয়েছে?"
"কিছু না বাবা, বয়স হয়েছে তো, একটু ব্যথা করে।"
রাতে খাবার টেবিলে বাবা বললেন, "তোর মায়ের পা তিন মাস ধরে ফুলে আছে। ডাক্তার দেখানো দরকার, কিন্তু হাটে-বাজারে যা রোজগার হয়, তাতে সংসারই চলে না ঠিকমতো।"
সোহেল থমকে গেল। "কেন আমাকে বলোনি?"
বাবা মাথা নিচু করে বললেন, "তুই তো নিজের খরচ নিয়েই হিমশিম খাস শুনি, তাই বলিনি। আমরা মানিয়ে নিচ্ছিলাম।"
সেই রাতে সোহেল ঘুমাতে পারল না। মোবাইলে হিসাব করতে বসল—গত ছয় মাসে সে কত টাকা খরচ করেছে অপ্রয়োজনীয় জিনিসে। নতুন ফোনের দাম, বন্ধুদের সাথে রেস্টুরেন্টে খরচ, বছরে দুইবার শুধু ঘুরতে যাওয়ার খরচ—সব মিলিয়ে অঙ্কটা মায়ের চিকিৎসার খরচের চেয়ে অনেক বেশি।
সে মনে করার চেষ্টা করল, শেষ কবে মায়ের সাথে বসে পাঁচ মিনিট কথা বলেছে ফোনে, শুধু "আছি, ভালো আছি" বলা ছাড়া। মনে করতে পারল না।
পরদিন সকালে মাকে নিয়ে জেলা শহরের হাসপাতালে গেল। ডাক্তার দেখে বললেন, কিডনির সমস্যার কারণে পা ফুলছে, দ্রুত চিকিৎসা শুরু না করলে অবস্থা খারাপ হতে পারত। সোহেল সেদিনই প্রয়োজনীয় ওষুধ আর টেস্ট করাল, যা তার এক মাসের বেতনের প্রায় অর্ধেক খরচ হয়ে গেল।
ফেরার পথে মা বললেন, "বাবা, এত টাকা খরচ করলি, তোর নিজের কী হবে?"
সোহেলের চোখ ভিজে গেল। "মা, তুমি আমার জন্য সারাজীবন যা করেছ, তার তুলনায় এটা কিছুই না। আমি এতদিন ভুল বুঝেছিলাম—ভেবেছিলাম মাসে কিছু টাকা পাঠালেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু তোমাদের কষ্টটা আমি দেখতেই পাইনি, কারণ দেখার চেষ্টাই করিনি।"
ঢাকায় ফিরে সোহেল তার খরচের অভ্যাস বদলে ফেলল। প্রতি সপ্তাহে বাবা-মাকে ফোন করে অন্তত আধা ঘণ্টা কথা বলার নিয়ম করল—শুধু টাকার খোঁজ নয়, তাদের শরীর, তাদের দিন কেমন কাটছে, সেসব নিয়ে। প্রতি মাসে যা পাঠাত তার চেয়ে বেশি টাকা এখন পাঠায়, আর বছরে অন্তত তিনবার বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করে।
আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, বাবা-মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করার কথা—শুধু আর্থিক সাহায্য নয়, বরং কোমল কথা বলা, তাদের কষ্ট বোঝা, আর তাদের প্রতি মনোযোগী থাকা।
আমরা অনেকেই মনে করি, মাসে কিছু টাকা পাঠালেই বাবা-মায়ের হক আদায় হয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃত হক আদায় হয় তাদের কষ্ট বোঝার চেষ্টায়, তাদের পাশে সময় দেওয়ায়, আর তাদের প্রয়োজনের প্রতি সজাগ থাকায়।
যাদের বাবা-মা এখনো বেঁচে আছেন, তারা ভাগ্যবান—এখনো সময় আছে ভুল শুধরে নেওয়ার।




