১১ আগস্ট, ২০২৬ ইং
মেডিকেল প্রফেশন ছাড়ার পর থেকে পুরনো কলিগরা খুব কমই খোঁজখবর রেখেছিল। এক্ষেত্রে অবশ্য তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই; বরং আমিই হয়তো সময় ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে নিজেকে ঠিকভাবে মানিয়ে নিতে পারিনি। মানিয়ে নিতে পারলে হয়তো চার আঙুলের কপালে অর্থকড়ির অভাবটাও থাকত না। থাক, সেসব পুরনো কথা।
এমনিতেই গত কয়েকদিন ধরে স্থানীয় গ্রামের বাজারে নিজের শোরুমের কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ততায় সময় কাটছে। দম ফেলার ফুরসতটুকুও যেন হারিয়ে গেছে।
সকাল থেকেই কাজের মধ্যে ডুবে ছিলাম। হঠাৎ মুঠোফোনটা বড্ড সজোরে বেজে উঠল। স্ক্রিনে চোখ রাখতেই খানিকটা চমকে ওঠার মতো অবস্থা। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বেশ পরিষ্কারভাবে শুনতে পেলাম—“শুভ, তোমার এলাকায় পরিদর্শনের কাজে যাব, দেখা হবে হয়তো।”
ডাঃ মাসুদার আকন্দ ভাই—গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার স্বাস্থ্য প্রধান কর্মকর্তা। সবকিছুকে ছাপিয়ে তার সঙ্গে আমার একটা আলাদা সখ্য আছে। হয়তো সেই সখ্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ তার আন্তরিকতা, সরলতা এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা।
এখন থেকে সাত-আট বছর আগে, যখন সরাসরি মেডিকেল প্রফেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তখন প্রায়ই শহরের বিভিন্ন ক্লিনিকে উঁকিঝুঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতাম।
সেই সময় মাসুদার ভাই গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
একদিন জরুরি বিভাগে তিনি রোগী দেখার সময় গুরুতর আহত এক রোগীকে নিজ হাতে ট্রলিতে উঠাতে গিয়ে বুকের বাঁ পাশে ভীষণ আঘাত পেয়েছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টিকে তিনি খুব একটা গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ফেরার পথে বাসের মধ্যেই প্রচণ্ড বুকব্যথা অনুভব করেন। কোনো রকমে সেই যাত্রা শেষ করতে পারলেও, রাতে আবারও বুকে ব্যথা অনুভব করেন।
অবশেষে ইসিজি করানোর জন্য নিকটস্থ ক্লিনিকে এলে তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। বুকের ব্যথায় তিনি তখন ভীষণ অস্থির। আমরা তাকে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলাম। এমনকি তার শরীরে ইসিজির লিডগুলোও আমিই বসিয়েছিলাম।
সেই ছোট্ট ঘটনাটাই হয়তো আমাদের সম্পর্কের একটা আলাদা জায়গা তৈরি করে দিয়েছিল।
তারপর সময়ের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের দূরত্ব কিছুটা বেড়েছিল। তবুও টুকটাক তার খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করেছিলাম। পরে তিনি প্রমোশন পেয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে ফরেনসিক মেডিসিনের লেকচারার হিসেবে যুক্ত হন। সেখানে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর অবশেষে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হন।
মাঝেমধ্যেই মুঠোফোনে রোগী-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে আলাপচারিতা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, কখনোই তার কাছ থেকে নিরাশ হতে হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে গোবিন্দগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত হয়েছে—এটা নিঃসন্দেহে ভালো খবর। কিন্তু শুধু শয্যা বাড়ালেই তো একটি হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গ হয় না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত লোকবল, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, অবকাঠামো এবং সর্বোপরি সেবার সক্ষমতা। সেই জায়গায় এখনো বিস্তর ঘাটতি রয়েই গেছে।
তারপরও মানুষটা থেমে নেই। সীমাবদ্ধতা আছে, ঘাটতি আছে, প্রতিকূলতা আছে—তারপরও নিজের জায়গা থেকে সর্বোচ্চটা দিয়ে গোবিন্দগঞ্জবাসীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
এবার একটা অপ্রিয়, তিতা সত্য কথা বলি। বলতে পারেন, অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি—গোবিন্দগঞ্জবাসী বিগত সময়ে যে সকল তথাকথিত স্যুটেড-বুটেড হারামজাদা স্বাস্থ্য প্রধান কর্মকর্তা পেয়েছিলেন, তাদের অনেকের চেয়ে মাসুদার আকন্দ ভাই হাজার গুণ বেশি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন।
কারণ পদে বসা আর দায়িত্বশীল হওয়া এক কথা নয়; চেয়ার পাওয়া আর মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা থাকা—দুটোই সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
সময়টা আজ আমাদের হাতে খুব বেশি ছিল না। তারপরও অল্প সময়টুকু বেশ ভালোই কেটেছে। এমনকি স্বয়ং উপস্থিত থেকে তার পরিদর্শন কার্যক্রমও দেখেছি।
পদ-পদবি, চেয়ার কিংবা ক্ষমতা—সবই সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। কিন্তু একজন মানুষের আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাই শেষ পর্যন্ত তাকে আলাদা করে চেনায়।
শুভেচ্ছা রইল, ডাঃ মাসুদার আকন্দ ভাই।
এগিয়ে যান—দূর থেকে বহুদূর।
১১ আগস্ট, ২০২৬ ইং
শরীফ শুভ

Hi bro, Would you like to delegate your SP to @steemx.org account, we will give you 0.40Steem /1k SP Delegation.