horro story

in #bangla14 days ago

মিরপুর-১ এর ছয়তলা বাড়ি: বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে একটি রহস্যময় হরর গল্প
কিছু গল্প বলা কঠিন কারণ সেগুলোর কোনো স্পষ্ট সমাপ্তি থাকে না। এটিও তেমনই একটি গল্প। এই লেখাটির ঘটনাগুলো আমার জীবনের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যখন আমি আমার স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে নিয়ে ঢাকার মিরপুর-১ এর একটি পুরানো ছয়তলা বিল্ডিংয়ে থাকতাম।

আমি যতটা সম্ভব সততার সাথে গল্পটি বলার চেষ্টা করেছি। অদ্ভুত শব্দগুলোর পেছনে কোনো অলৌকিক কারণ ছিল কি না, ছাদে কী নড়াচড়া করছিল, কিংবা আমাদের বাড়িতে কেউ গোসল না করা সত্ত্বেও বাথরুম থেকে পানি পড়ার বা গোসলের শব্দ কোথায় থেকে এসেছিল—তা আমি জানি না। এমনকি পরে একজন অসুস্থ ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে এই ঘটনার কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তাও আমার জানা নেই। আমি শুধু বলতে পারি আমরা যা অনুভব করেছি। প্রশ্নগুলো আজও উত্তরহীন।

অধ্যায় এক: পুরানো ছয়তলা বিল্ডিং
ঢাকার মিরপুর-১। এটি একটি ব্যস্ত শহরের খুবই সাধারণ একটি অংশ ছিল, যেখানে মানুষের আনাগোনা ও গাড়ির হর্নে জীবন স্বাভাবিক নিয়মে চলত। আমাদের বাসাটি ছিল একটি পুরানো ছয়তলা বিল্ডিংয়ে। আমি সেখানে আমার স্ত্রী এবং চার বছরের ছেলেকে নিয়ে বসবাস করতাম। দিনের বেলায় বিল্ডিংটিতে ভয়ের কিছু ছিল না; এটি ছিল সাধারণ একটি আবাসিক ভবন, যেখানে আরও কয়েকটি পরিবার থাকত। দেয়ালগুলো ছিল পুরানো, সিঁড়িগুলোও ছিল বহুদিনের পুরোনো।

আমাদের জীবনযাত্রাও ছিল একদম স্বাভাবিক। ভূত বা অলৌকিক গল্পে আমি কখনো তেমন বিশ্বাসী ছিলাম না, এসব বিষয় আমাকে কখনোই খুব একটা ভাবাতো না।

কিন্তু আস্তে আস্তে রাতের পরিবেশগুলো অন্যরকম লাগতে শুরু করল। প্রথমে পরিবর্তনগুলো ছিল খুবই সামান্য: ছাদ থেকে কোনো শব্দ, গভীর রাতে অদ্ভুত কোনো আওয়াজ, কিংবা দরজায় টোকা পড়ার শব্দ। প্রথমে এগুলোকে তেমন গুরুত্ব দিইনি, কিন্তু কয়েক দিন পর এই শব্দগুলো উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। আর ঠিক এভাবেই গল্পটির শুরু হয়েছিল।

অধ্যায় দুই: ছাদের ওপর পায়ের শব্দ
প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল এক রাতে। আমি তখন ছাদেই ছিলাম, হঠাৎ শুনতে পেলাম কারও হাঁটার শব্দ—ধীরে ধীরে কেউ যেন ছাদের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আমি থেমে গেলাম, মনোযোগ দিয়ে শুনলাম এবং শব্দটা আবার পেলাম। শব্দটা বেশ স্পষ্ট ছিল, তবুও আমাদের মধ্যে কোনো ভয় কাজ করেনি। আমি আতঙ্কিত হইনি বা নিচে ছুটে যাইনি, ভেবেছিলাম পুরনো বিল্ডিংয়ে এমন সাধারণ কোনো কারণ থাকতেই পারে।

কিন্তু শব্দটা বারবার ফিরতে লাগল। এরপর বিল্ডিংয়ের অন্যেরাও গভীর রাতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ ও অদ্ভুত সব আওয়াজ নিয়ে কথা বলা শুরু করল। যখন সবাই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করল, তখন প্রতিটি অদ্ভুত শব্দ আরও ভীতিদায়ক হয়ে উঠতে লাগল।

অধ্যায় তিন: কড়া নাড়ার শব্দ
রাতের বেলা দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দগুলো খুব জোরালো ছিল না—হালকা কয়েকটি টোকা, তারপর পিনপতন নীরবতা। আমি সবকিছু যৌক্তিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করলাম, ভাবলাম হয়তো বাতাস কিংবা করিডোর দিয়ে শব্দ আসছে। কিন্তু ঘটনাগুলো ঘন ঘন ঘটতে শুরু করায় একটা প্যাটার্ন তৈরি হতে লাগল।

এরপর শুরু হলো আমাদের নিজেদের ঘর নিয়ে অদ্ভুত কাণ্ড। একদিন বিল্ডিংয়ের এক প্রতিবেশী জানাল যে, গভীর রাতে আমাদের ফ্ল্যাট থেকে কল খুলে দেওয়ার বা কেউ গোসল করার শব্দ শুনতে পায়। আমরা তো শুনে সম্পূর্ণ অবাক, কারণ আমাদের পরিবারের কেউ তখন গোসল করছিল না। আমরা যখন তাদের বললাম, "আমরা তো গোসল করছিলাম না," তখন তাদের ভয় আরও বেড়ে গেল। এই উত্তরহীন প্রশ্নটি পুরো বিল্ডিংয়ের পরিবেশ পাল্টে দিল।

অধ্যায় চার: ছাদে কী যেন নড়াচড়া করছিল
এক রাতে আমরা ছাদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, অন্ধকারে কয়েকটি ছায়া বা আকৃতি ছাদের ওপর এদিক-সেদিক চলাফেরা করছে। সেগুলো মানুষ, প্রাণী নাকি অন্ধকারের কোনো বিভ্রম—তা আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারিনি।

এই অনিশ্চয়তা ছিল ভীতিকর। শেষ পর্যন্ত আমরা স্থানীয় মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং তাকে সব খুলে বললাম—পায়ের শব্দ, টোকা পড়া, গোসলের শব্দের গুঞ্জন এবং ছাদে চলাফেরা করার দৃশ্য। তিনি মনোযোগ দিয়ে সব শুনে আমাদের জন্য দোয়া পড়লেন। এর কিছুদিন পরই আমরা খবর পেলাম এলাকার এক অসুস্থ ব্যক্তি মারা গেছেন।

অধ্যায় পাঁচ: নীরবতা এবং শেষ প্রশ্ন
যদিও ওই লোকটির দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ছিল এবং তার মৃত্যুর একটি স্বাভাবিক কারণও ছিল, তবে ঘটনাগুলোর টাইমিং ছিল লক্ষণীয়। ইমাম সাহেবের কাছে যাওয়ার পর, তার দোয়া এবং ওই অসুস্থ ব্যক্তির মৃত্যুর পরপরই ছাদের সেই অদ্ভুত পায়ের শব্দ, টোকা পড়া ও গোসলের শব্দ—সব চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। বিল্ডিংটা আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেল।

বহু বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু মিরপুর-১ এর সেই পুরানো ছয়তলা বিল্ডিংয়ের স্মৃতিগুলো আজও মুছে যায়নি। আজও যখন সেই ছাদের কথা মনে পড়ে, মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়: সেদিন রাতে ছাদে আসলে কে হেঁটে বেড়াচ্ছিল?

আমি জানি না, হয়তো কোনোদিনও জানতে পারব না।