বয়স বাড়ার সঙ্গে সময় এত দ্রুত চলে যাচ্ছে বলে মনে হয় কেন?
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
ছোটবেলায় একটা বছর যেন শেষই হতে চাইত না। ঈদের অপেক্ষা, জন্মদিনের অপেক্ষা, স্কুলের ছুটি কিংবা নতুন ক্লাসে ওঠার অপেক্ষা—সবকিছুতেই মনে হতো সময় বুঝি খুব ধীরে চলছে। একটা সপ্তাহও অনেক লম্বা মনে হতো।কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন সেই সময়ের গতি বদলে গেছে।একসময় মনে হতো, “একটা বছর শেষ হতে এত দেরি কেন?” আর এখন অনেকেই অবাক হয়ে বলেন, “এই তো সেদিন বছর শুরু হলো, এর মধ্যেই এতগুলো মাস চলে গেল!”আসলে সময়ের গতি বদলায়নি। ঘড়ির কাঁটা ছোটবেলায় যেমন চলত, এখনো ঠিক তেমনই চলছে। তাহলে কেন আমাদের কাছে বয়স বাড়ার সঙ্গে সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে বলে মনে হয়?এর পেছনে রয়েছে আমাদের মস্তিষ্ক, স্মৃতি, অভিজ্ঞতা এবং জীবনের পরিবর্তনশীলতার এক আশ্চর্য সম্পর্ক।ছোটবেলায় আমাদের পৃথিবী ছিল নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় ভরা। প্রথমবার স্কুলে যাওয়া, প্রথমবার নতুন বন্ধু তৈরি করা, প্রথমবার কোনো জায়গায় ঘুরতে যাওয়া, নতুন কোনো উৎসব দেখা—প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু নতুন ঘটনা ঘটত।আমাদের মস্তিষ্ক নতুন অভিজ্ঞতাগুলোকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখে। ফলে সেই সময়ের একটি দিন বা একটি সপ্তাহের স্মৃতিতে অনেক বেশি ঘটনা জমা হতে পারে।অন্যদিকে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনে অনেক কিছু নিয়মিত হয়ে যায়।একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, একই পথে যাওয়া, একই ধরনের কাজ করা, একই পরিবেশে থাকা—দিনগুলো অনেকটা একই রকম দেখতে শুরু করে।এখানেই আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—নতুনত্ব।নতুন অভিজ্ঞতা আমাদের সময়কে মানসিকভাবে “বড়” করে তুলতে পারে। আর একই ধরনের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি সময়কে আমাদের স্মৃতিতে তুলনামূলকভাবে “ছোট” করে দিতে পারে।ধরুন, আপনি জীবনে প্রথমবার কোনো নতুন শহরে গেলেন। কয়েক দিন সেখানে কাটালেন। নতুন রাস্তা, নতুন মানুষ, নতুন খাবার, নতুন পরিবেশ—সবকিছুই আপনার মস্তিষ্ককে প্রচুর তথ্য দিচ্ছে।ফিরে এসে মনে হতে পারে, “মাত্র পাঁচ দিন ছিলাম, অথচ মনে হচ্ছে অনেকদিন কেটে গেছে!”কিন্তু অন্যদিকে একই ধরনের রুটিনে পাঁচ দিন কাটালে হয়তো মনে হবে, “এই তো, কয়েকটা দিন কীভাবে চলে গেল বুঝতেই পারলাম না!”অর্থাৎ ঘড়ির সময় একই থাকলেও মস্তিষ্কের কাছে সেই সময়ের অভিজ্ঞতা একই রকম নয়।আরেকটি বড় কারণ হলো—বয়সের সঙ্গে একটি বছরের তুলনামূলক গুরুত্ব কমে যায়।ধরুন, একজন ৫ বছরের শিশুর জীবনে ১ বছর তার জীবনের মোট সময়ের একটি বড় অংশ। কিন্তু একজন ৫০ বছর বয়সী মানুষের জীবনে একই ১ বছর তুলনামূলকভাবে ছোট একটি অংশ।এটি সময়ের প্রকৃত গতি পরিবর্তন করে না, কিন্তু সময়কে আমরা কীভাবে উপলব্ধি করি তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।তবে শুধু বয়সের হিসাব দিয়ে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না।আমাদের স্মৃতিও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে।মজার ব্যাপার হলো, আমরা সময়কে শুধু বর্তমান মুহূর্তে বসে বিচার করি না। অনেক সময় অতীতের দিকে তাকিয়েও বিচার করি।যেমন ধরুন, গত এক মাসে আপনার জীবনে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রায় প্রতিদিন একই রকম কেটেছে। মাসের শেষে ফিরে তাকালে মনে হতে পারে, “এত দ্রুত এক মাস চলে গেল!”কারণ স্মৃতিতে আলাদা করে মনে রাখার মতো ঘটনা কম ছিল।অন্যদিকে কোনো ভ্রমণ, নতুন অভিজ্ঞতা বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দিয়ে ভরা এক মাস পরে ফিরে তাকালে সেই সময়টা অনেক দীর্ঘ মনে হতে পারে।অর্থাৎ সময় কত দ্রুত গেছে বলে মনে হচ্ছে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সেই সময়ের মধ্যে কতটা বৈচিত্র্য ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল তার ওপর।এ কারণেই ছুটির দিন কখনো খুব দ্রুত চলে যায়।সকালবেলা ভাবলেন, “আজ তো অনেক সময় আছে।”কিছুক্ষণ পর দুপুর।তারপর বিকেল।তারপর রাত।মনে হয়, “এত তাড়াতাড়ি দিন শেষ হয়ে গেল!”অন্যদিকে কোনো বিরক্তিকর কাজের মধ্যে ৩০ মিনিট বসে থাকলে মনে হতে পারে, আধা ঘণ্টা যেন আধা দিনের সমান!এখানে বর্তমান সময়ের অনুভূতি এবং পরে সেই সময়কে স্মরণ করার অনুভূতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।আর বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের জীবন অনেক সময় দায়িত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।পড়াশোনা, কাজ, পরিবার, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, দায়িত্ব, বিভিন্ন চিন্তা—সব মিলিয়ে মস্তিষ্ক একসঙ্গে অনেক কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে।ফলে দিনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে আমরা অনেক সময় আলাদা করে অনুভব করি না।সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকার পর হঠাৎ মনে হয়—“আজকের দিনটাও শেষ!”এরপর এক সপ্তাহ।তারপর এক মাস।তারপর একটি বছর।এভাবেই অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না, সময় কোথা দিয়ে চলে যাচ্ছে।তবে এর অর্থ এই নয় যে বয়স বাড়লেই জীবন অবশ্যই একঘেয়ে হয়ে যাবে।বরং এখানেই রয়েছে একটি সুন্দর শিক্ষা।আমরা যদি জীবনে নতুন অভিজ্ঞতা যোগ করি, নতুন কিছু শিখি, নতুন জায়গায় যাই, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই, সৃজনশীল কিছু করি কিংবা প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্তকে সচেতনভাবে অনুভব করি—তাহলে সময়কে আমাদের কাছে আরও অর্থপূর্ণ মনে হতে পারে।এর জন্য প্রতিদিন বড় কোনো ঘটনা ঘটতে হবে এমন নয়।সকালের আকাশের দিকে কয়েক মিনিট তাকানো, কোনো নতুন বই পড়া, নতুন কোনো দক্ষতা শেখা, পরিবারের সঙ্গে মন দিয়ে কথা বলা, কোনো বন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দেখা করা—এমন ছোট ঘটনাও স্মৃতিতে জায়গা করে নিতে পারে।কারণ জীবনের মূল্য শুধু কত বছর বেঁচে থাকলাম তার মধ্যে নয়।বরং সেই বছরগুলোর মধ্যে কতটা জীবন অনুভব করলাম—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
হয়তো এ কারণেই শৈশবের কয়েকটি দিন এখনো এত দীর্ঘ মনে হয়। কারণ তখন পৃথিবী ছিল নতুন। প্রতিটি দিন ছিল আবিষ্কারের মতো।একটি সাধারণ বিকেলও ছিল বিশেষ।একটি নতুন খেলনাও ছিল আনন্দের কারণ।বৃষ্টিতে ভেজা ছিল একটি ঘটনা।বন্ধুর সঙ্গে কাটানো কয়েক ঘণ্টা ছিল একটি স্মৃতি।বয়স বাড়ার সঙ্গে পৃথিবী হয়তো ছোট হয়ে যায় না—আমরাই অনেক কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে যাই।তাই সময়কে ধীর করার কোনো জাদু নেই। ঘড়ির কাঁটাকে থামানোও সম্ভব নয়।কিন্তু আমরা চাইলে সময়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বদলাতে পারি।প্রতিদিনকে শুধু পার করে দেওয়ার পরিবর্তে একটু অনুভব করা যায়।নতুন কিছু শেখা যায়।পুরোনো মানুষদের সঙ্গে কথা বলা যায়।ছোট আনন্দগুলো লক্ষ্য করা যায়।কখনো কাজের মাঝখানে একটু থেমে নিজের চারপাশের পৃথিবীটাকে দেখা যায়।কারণ শেষ পর্যন্ত সময় হয়তো সত্যিই দ্রুত যাচ্ছে না।আমাদের জীবনই দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শৈশবে আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সময় গুনতাম।আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একসময় আমরা পেছনে তাকিয়ে সময়ের হিসাব করতে শুরু করি।তখন বুঝতে পারি—যে দিনগুলোকে একসময় খুব সাধারণ মনে হয়েছিল, সেগুলোই আসলে আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর অংশ হয়ে গেছে।তাই হয়তো প্রশ্নটা শুধু “সময় এত দ্রুত চলে যাচ্ছে কেন?” হওয়া উচিত নয়।প্রশ্নটা হতে পারে—
“যে সময়টা চলে যাচ্ছে, তার কতটা আমি সত্যিই অনুভব করছি?”কারণ সময় থামবে না।কিন্তু তার ভেতরে আমরা কীভাবে বাঁচব—সেই সিদ্ধান্তটা অনেকটাই আমাদের।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community