“ভাই, সময়ই পাই না!”“সারাদিন এত কাজ করি, কিন্তু কাজ শেষ হয় না।”“নিজের জন্য সময় কোথায়?”এই কথাগুলো আমরা প্রায় প্রতিদিনই বলি। কখনো বন্ধুর কাছে, কখনো পরিবারের কাছে, আবার কখনো নিজের কাছেই।সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমাদের ব্যস্ততা। ফোনে নোটিফিকেশন, মেসেজের রিপ্লাই, অফিসের কাজ, পড়াশোনা, মিটিং, বাজার, পরিবারের দায়িত্ব, সোশ্যাল মিডিয়া—সব মিলিয়ে মনে হয়, ২৪ ঘণ্টা যেন কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।কিন্তু একটা প্রশ্ন কি আমরা খুব কমই করি?আমরা কি সত্যিই এতটা ব্যস্ত, নাকি আমাদের জীবনটাই একটু অগোছালো?দুটো জিনিস দেখতে প্রায় একই রকম হলেও আসলে এক নয়।ব্যস্ত মানুষ আর অগোছালো মানুষের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে।ব্যস্ত মানুষ জানে সে কী করছে।অগোছালো মানুষ শুধু জানে—তার অনেক কিছু করার আছে।ব্যস্ততা আর উৎপাদনশীলতা এক জিনিস নয় ধরুন, একজন মানুষ সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করছে।সে একটার পর একটা কাজ করছে। ফোন ধরছে, ই-মেইলের উত্তর দিচ্ছে, মেসেজের রিপ্লাই দিচ্ছে, এক কাজ থেকে আরেক কাজে যাচ্ছে।রাত ১০টায় তার মনে হচ্ছে—“আজকে তো সারাদিন কাজ করলাম!”কিন্তু একটু হিসাব করলে দেখা গেল, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটাই করা হয়নি।এটাই আমাদের একটা বড় সমস্যা।আমরা অনেক সময় ব্যস্ত থাকাকে কাজ করার সমান মনে করি।অথচ সব কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়।একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করতে ২ ঘণ্টা মনোযোগ দেওয়া অনেক সময় ১০ ঘণ্টা এলোমেলোভাবে ব্যস্ত থাকার চেয়েও বেশি ফল দিতে পারে।আমরা সময়ের অভাবকে দোষ দিই।কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা সময়ের নয়, অগ্রাধিকারের।আপনার ফোন কি আপনার সময় খাচ্ছে?একটা ছোট পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।আপনি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে বসেছেন।ঠিক তখনই ফোনে একটা নোটিফিকেশন এলো।আপনি ভাবলেন, “এক মিনিট দেখি।”তারপর একটা মেসেজের উত্তর দিলেন।এরপর ফেসবুক খুললেন।একটা ভিডিও দেখলেন।কমেন্ট পড়লেন।আরেকটা ভিডিও চলে এলো।হঠাৎ ২০ মিনিট চলে গেল।তারপর আপনি আবার কাজে ফিরলেন।কিন্তু মনোযোগটা আর আগের জায়গায় নেই।এভাবে দিনে ১০ বার হলে?আপনি হয়তো বলবেন, “আমার হাতে সময় নেই।”আসলে সময় ছিল।সময়টা ছোট ছোট টুকরো হয়ে হারিয়ে গেছে।আমরা অনেক সময় বড় কোনো কাজের কারণে সময় হারাই না।বরং হারাই ছোট ছোট “এক মিনিট” করে।এক মিনিট নোটিফিকেশন।দুই মিনিট স্ক্রলিং।পাঁচ মিনিট অপ্রয়োজনীয় কথোপকথন।দশ মিনিট উদ্দেশ্যহীনভাবে ইউটিউব দেখা।দিন শেষে এই ছোট ছোট সময়গুলো যোগ করলে দেখা যায়, আমাদের অনেক সময় আসলে আমাদেরই অজান্তে অন্য কোথাও চলে গেছে।“সবকিছু একসাথে” করার চেষ্টা আমাদের আরও ধীর করে দেয় আরেকটা ব্যাপার খুব সাধারণ।আমরা একসাথে অনেক কিছু করতে চাই।ল্যাপটপে কাজ চলছে।পাশে ফোন।ফোনে মেসেজের উত্তর।মাঝে ফেসবুক।তারপর একটা কল।এর মধ্যে কারো সঙ্গে কথা বলা।আবার কাজ।আমরা এটাকে বলি “মাল্টিটাস্কিং”।কিন্তু অনেক সময় এটা মাল্টিটাস্কিং নয়।এটা হচ্ছে বারবার মনোযোগ বদলানো।ফলে কোনো কাজই পুরো মন দিয়ে করা হয় না।একটা কাজ শেষ হতে যে সময় লাগার কথা, তার চেয়ে বেশি সময় লাগে।ভুলও বেশি হয়।মানসিক ক্লান্তিও বাড়ে।দিন শেষে মনে হয়—“এত কিছু করলাম, তবু কিছুই যেন ঠিকমতো করা হলো না।”অগোছালো জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষণ কী?আপনার কাজের তালিকা যদি প্রতিদিন বড় হতে থাকে, কিন্তু আপনি জানেন না কোন কাজটা আগে করবেন—তাহলে হয়তো আপনি ব্যস্তের চেয়ে বেশি অগোছালো।আরেকটা লক্ষণ হলো—আপনি প্রায়ই জরুরি কাজকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফেলে রাখেন।তারপর যখন সময় কমে যায়, তখন চাপ বাড়ে।চাপ বাড়লে ভুল হয়।ভুল হলে আবার সময় লাগে।সময় কমে গেলে আপনি আরও বেশি অস্থির হন।তারপর মনে হয়—“আমার জীবনটাই এত কঠিন!”অথচ সমস্যাটা হয়তো জীবন নয়।সমস্যাটা হলো, আমরা কাজগুলোকে সময়মতো জায়গা দিইনি। সবসময় “হ্যাঁ” বলাও এক ধরনের অগোছালো জীবন আমরা অনেকেই মানুষকে না বলতে পারি না।কেউ বলল, “একটু সময় দাও।”আমরা দিলাম।কেউ বলল, “এই কাজটা করে দাও।”আমরা রাজি হলাম।কেউ বলল, “একটু কথা বলি?”আমরা নিজের কাজ রেখে কথা বলতে শুরু করলাম।মানুষকে সাহায্য করা অবশ্যই ভালো।কিন্তু আপনি যদি সবার প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের আগে রাখেন, তাহলে একসময় নিজের জীবনটাই অন্যের কাজের তালিকা হয়ে যাবে।সব অনুরোধ গ্রহণ করা ভালো মানুষ হওয়ার প্রমাণ নয়।কখনো কখনো “এখন পারছি না” বলাটাও নিজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।তাহলে সত্যিকারের ব্যস্ত মানুষ কেমন?সত্যিকারের ব্যস্ত মানুষ হয়তো অনেক কাজ করে।কিন্তু সে জানে কোন কাজটা গুরুত্বপূর্ণ।সে সব মেসেজের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় না।সব ফোন ধরতে হয়—এমন মনে করে না।সব নিমন্ত্রণে যেতে হয় না।সব আলোচনায় অংশ নিতে হয় না।সে জানে, তার সময় সীমিত।তাই সে নিজের সময়কে গুরুত্ব দেয়।তার জীবন হয়তো ব্যস্ত।কিন্তু সেখানে একটা দিকনির্দেশনা থাকে।অন্যদিকে অগোছালো জীবনে কাজের অভাব থাকে না, কিন্তু দিকনির্দেশনার অভাব থাকে।একটু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য কী করা যায়?খুব বড় কোনো পরিবর্তনের দরকার নেই।প্রথমে শুধু তিনটা প্রশ্ন করুন।১. আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ কোনটা?সব কাজ একসাথে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।যে কাজটা আপনার পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, ব্যবসা বা ব্যক্তিগত জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে—সেটাকে আগে রাখুন।২. কোন কাজগুলো আমি না করলেও চলবে?আমরা অনেক সময় কাজের তালিকা ছোট করতে চাই না।অথচ ভালো সময় ব্যবস্থাপনা শুধু বেশি কাজ করা নয়।বরং অপ্রয়োজনীয় কাজ বাদ দেওয়াও সময় ব্যবস্থাপনার অংশ।৩. কোন জিনিসটা আমার মনোযোগ সবচেয়ে বেশি চুরি করছে?সেটা ফোন হতে পারে।সোশ্যাল মিডিয়া হতে পারে।অপ্রয়োজনীয় আড্ডা হতে পারে।অতিরিক্ত চিন্তা হতে পারে।অথবা এমন মানুষও হতে পারে, যার সঙ্গে কথা বলার পর আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানসিকভাবে ক্লান্ত থাকেন।সমস্যাটা চিহ্নিত করতে পারলেই সমাধানের অর্ধেক হয়ে যায়।
আমরা প্রায়ই বলি—“সময় নেই।”হয়তো সত্যিই কিছু সময় কম।কিন্তু অনেক সময় আমাদের আসল সমস্যা সময়ের অভাব নয়।সমস্যা হলো, আমরা সময়কে কোথায় ব্যয় করছি সেটা জানি না।২৪ ঘণ্টা সবার জন্যই সমান।কেউ সেই ২৪ ঘণ্টায় একটা জীবন গুছিয়ে নেয়।কেউ একই ২৪ ঘণ্টায় সারাদিন ছুটে বেড়িয়েও রাতে এসে ভাবে—“আজকে আসলে করলামটা কী?”তাই আজ থেকে নিজেকে শুধু “ব্যস্ত” বলার আগে একটু থামুন।নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—“আমি কি সত্যিই অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি, নাকি শুধু অনেক কাজের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি?”কারণ ব্যস্ত থাকা খুব সহজ।কিন্তু সঠিক জায়গায় ব্যস্ত থাকা—সেটাই দক্ষতা।আর জীবনে সবসময় আরও বেশি সময় দরকার হয় না।কখনো কখনো দরকার হয়—একটু কম কাজ,একটু কম স্ক্রলিং,একটু কম “হ্যাঁ”,একটু বেশি মনোযোগ,আর নিজের জীবনের জন্য একটু পরিষ্কার অগ্রাধিকার।হয়তো তখন বুঝতে পারবেন—আপনার সময় এত কম ছিল না।আপনার সময়টা শুধু একটু অগোছালো ছিল।
This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community