কেন একই জায়গায় বারবার গেলে সেই জায়গার গন্ধও পরিচিত মনে হয়?
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
কখনো কি এমন হয়েছে—অনেকদিন পর কোনো পরিচিত জায়গায় গিয়ে হঠাৎ মনে হলো, “এই জায়গাটার গন্ধটা ঠিক আগের মতোই আছে!” জায়গাটা হয়তো আপনার পুরোনো স্কুল, নানাবাড়ি, কোনো বন্ধুর বাসা, শৈশবের পাড়া কিংবা এমন কোনো রাস্তা যেখানে জীবনের একটা সময় নিয়মিত যাতায়াত ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জায়গাটাকে শুধু চোখে দেখে পরিচিত মনে হয় না; অনেক সময় সেখানকার বাতাসের গন্ধ, মাটির গন্ধ, পুরোনো দেয়ালের গন্ধ, গাছপালার গন্ধ কিংবা আশেপাশের খাবারের গন্ধও যেন আপনাকে বলে দেয়—“তুমি এখানে আগে এসেছ।” আসলে আমাদের নাক শুধু গন্ধ শনাক্ত করার যন্ত্র নয়। গন্ধের সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের স্মৃতি ও আবেগের এমন গভীর সম্পর্ক রয়েছে যে কোনো পরিচিত জায়গার গন্ধ অনেক সময় পুরো একটি পুরোনো সময়কে মনে ফিরিয়ে আনতে পারে।আমরা যখন কোনো জায়গায় যাই, তখন শুধু চোখ দিয়ে জায়গাটাকে চিনে রাখি না। আমাদের মস্তিষ্ক একই সঙ্গে শব্দ, আলো, তাপমাত্রা, স্পর্শ, বাতাসের অনুভূতি এবং গন্ধ—সবকিছুর তথ্য সংগ্রহ করে। কোনো জায়গার নিজস্ব গন্ধ তৈরি হতে পারে সেখানে থাকা গাছপালা, মাটি, কাঠ, দেয়াল, রান্নার খাবার, বাতাসের আর্দ্রতা এবং আশেপাশের অসংখ্য ছোট ছোট গন্ধের মিশ্রণে। আপনি হয়তো সচেতনভাবে এসব গন্ধ আলাদা করে মনে রাখছেন না, কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক সেগুলোর একটি পরিচিত ছাপ তৈরি করে রাখতে পারে।গন্ধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, নাক থেকে পাওয়া তথ্য মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যেগুলো স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা কোনো গন্ধ শুঁকলেই মস্তিষ্ক সেটিকে শুধু “কী গন্ধ” হিসেবে বিচার করে থেমে যায় না। সেই গন্ধের সঙ্গে আগে কোনো অভিজ্ঞতা যুক্ত আছে কি না, সেটাও খুঁজে দেখে। তাই কোনো পুরোনো জায়গায় গিয়ে পরিচিত গন্ধ পেলে হঠাৎ মনে হতে পারে, “আমি যেন আবার আগের সেই সময়টায় ফিরে গেছি।”ধরুন, আপনি ছোটবেলায় প্রায়ই দাদুর বাড়িতে যেতেন। বাড়িটির উঠানে ছিল ভেজা মাটির গন্ধ, পাশে কিছু পুরোনো কাঠের আসবাব, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত নির্দিষ্ট ধরনের রান্নার গন্ধ, আর চারপাশে ছিল গাছপালা। বহু বছর পর সেই বাড়িতে ফিরে গিয়ে হয়তো একই ধরনের বাতাসের গন্ধ পেলেন। মুহূর্তের মধ্যেই আপনার মনে পড়ে যেতে পারে শৈশবের কোনো সকাল, উঠানে বসে থাকা, পরিবারের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা কোনো পুরোনো ঘটনা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আপনি হয়তো সেই স্মৃতিটা প্রতিদিন ভাবেন না। কিন্তু একটি গন্ধ সেটাকে হঠাৎ সামনে নিয়ে এলো।এটাকে অনেকটা মস্তিষ্কের একটি পুরোনো দরজা খোলার মতো ভাবা যায়। দরজার সামনে হয়তো বছরের পর বছর কেউ দাঁড়ায়নি। কিন্তু পরিচিত গন্ধটি যেন সেই দরজার চাবি হয়ে কাজ করল। গন্ধের সঙ্গে যুক্ত পুরোনো স্মৃতির কিছু অংশ সক্রিয় হয়ে গেল। এ কারণেই কোনো কোনো গন্ধ আমাদের কাছে শুধু “ভালো” বা “খারাপ” লাগে না; তার সঙ্গে একটা সময়, একটা মানুষ, একটা জায়গা কিংবা একটা অনুভূতিও জড়িয়ে থাকে।একই জায়গায় বারবার যাওয়ার ফলে মস্তিষ্ক সেই পরিবেশের গন্ধের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রথমবার কোনো জায়গায় গেলে চারপাশের সবকিছুই নতুন থাকে। নতুন গন্ধও তখন আলাদা করে ধরা পড়ে। কিন্তু নিয়মিত সেখানে গেলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে বুঝে নেয়—এই গন্ধগুলো এই জায়গার স্বাভাবিক অংশ। ফলে গন্ধটি আর ততটা অচেনা মনে হয় না। বরং পরবর্তী সময়ে একই গন্ধ পাওয়া গেলে মস্তিষ্ক দ্রুত সেটিকে পরিচিত পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে পারে।এখানে আরেকটি বিষয় কাজ করে—অভ্যাস। আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় চারপাশের প্রতিটি তথ্য সমান গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করে না। যে জিনিস বারবার দেখা, শোনা বা শোঁকা হয়, তার প্রতি মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে কম মনোযোগ দিতে পারে। এজন্য নিজের ঘরের গন্ধ আমরা অনেক সময় আলাদা করে বুঝতে পারি না। কিন্তু বাইরে কয়েক ঘণ্টা থাকার পর ঘরে ফিরে হঠাৎ ঘরের পরিচিত গন্ধ টের পাওয়া যায়। অর্থাৎ গন্ধটি ঘরে ছিল, কিন্তু মস্তিষ্ক সেটিকে এতটাই পরিচিত হিসেবে গ্রহণ করেছিল যে আমরা সচেতনভাবে তার উপস্থিতি খেয়াল করছিলাম না।একই ঘটনা কোনো পরিচিত জায়গার ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। আপনি হয়তো কোনো রাস্তায় প্রতিদিন হাঁটেন। সেখানে পাশের দোকানের খাবারের গন্ধ, গাছের গন্ধ, ধুলোমাটির গন্ধ কিংবা বৃষ্টির পর ভেজা রাস্তার গন্ধ—সব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ তৈরি হয়। আপনি হয়তো কখনো বসে সেই গন্ধগুলো বিশ্লেষণ করেননি। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই রাস্তার কাছাকাছি গেলে মস্তিষ্কের কোথাও সেই পুরোনো পরিচিত পরিবেশের ছাপ সক্রিয় হতে পারে।এ কারণেই বৃষ্টির পর ভেজা মাটির গন্ধ অনেক মানুষের কাছে বিশেষ অনুভূতি তৈরি করে। কেউ সেই গন্ধে শৈশবের কথা মনে করেন, কেউ গ্রামের বাড়ির কথা, কেউ বর্ষার দিনের কথা। একই গন্ধ হলেও সবার অনুভূতি এক নয়। কারণ গন্ধের সঙ্গে যুক্ত স্মৃতি ব্যক্তিভেদে আলাদা। একজনের কাছে কোনো গন্ধ আনন্দের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে, অন্য কারও কাছে একই গন্ধ সম্পূর্ণ অন্য একটি অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।
কখনো আবার এমন হয়, কোনো জায়গার গন্ধ পরিচিত মনে হয় কিন্তু ঠিক কোথায় বা কখন সেই গন্ধ পেয়েছিলাম তা মনে করতে পারি না। এটাও স্বাভাবিক। আমাদের স্মৃতির সবকিছু সমানভাবে সচেতনভাবে সংরক্ষিত থাকে না। কোনো গন্ধের সঙ্গে যুক্ত অনুভূতি বা পরিচিতির অনুভব আগে ফিরে আসতে পারে, কিন্তু সেই গন্ধের নির্দিষ্ট ঘটনা বা সময় পরে মনে পড়তে পারে—অথবা একেবারেই মনে নাও পড়তে পারে।সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, গন্ধ অনেক সময় আমাদের কাছে জায়গার একটা অদৃশ্য পরিচয় তৈরি করে। কোনো শহর, বাড়ি, রাস্তা কিংবা মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু চোখে দেখা দৃশ্য দিয়ে তৈরি হয় না। তার সঙ্গে বাতাসের গন্ধও মিশে থাকে। তাই বহু বছর পর কোনো পুরোনো জায়গায় ফিরে গিয়ে হয়তো দেখবেন অনেক কিছু বদলে গেছে—বাড়ি নতুন হয়েছে, রাস্তা বদলে গেছে, দোকান নেই, গাছ কমে গেছে। তবুও বাতাসে হালকা কোনো পরিচিত গন্ধ পেলেই মনে হতে পারে, “সবকিছু বদলে গেলেও এই জায়গাটা কোথাও যেন একই রয়ে গেছে।”আসলে আমাদের মস্তিষ্ক পৃথিবীকে শুধু ছবি হিসেবে সংরক্ষণ করে না। একটি জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ, আলো আর অনুভূতিও সেখানে জায়গা করে নেয়। তাই কখনো কোনো গন্ধ হঠাৎ আপনাকে কয়েক বছর পেছনে নিয়ে যেতে পারে। আপনি হয়তো সেই মুহূর্তে পুরোনো কোনো ঘরে নেই, সেই মানুষগুলোর কাছেও নেই, সেই সময়টাও আর ফিরে আসেনি—তবুও একটি পরিচিত গন্ধ আপনার মস্তিষ্কে সেই সময়ের একটি দরজা খুলে দিতে পারে।তাই পরেরবার কোনো পুরোনো জায়গায় গিয়ে যদি মনে হয়, “এই গন্ধটা আমি চিনি,” তখন বিষয়টাকে শুধু নাকের অনুভূতি হিসেবে দেখবেন না। হয়তো আপনার মস্তিষ্ক সেই জায়গার সঙ্গে যুক্ত কোনো পুরোনো ছাপ চিনে ফেলেছে। পৃথিবীর অনেক স্মৃতি আমরা ছবিতে ধরে রাখি, কিছু স্মৃতি শব্দে, কিছু কথায়। আর কিছু স্মৃতি হয়তো কোনো অ্যালবামে নেই, কোনো লেখায় নেই—তারা লুকিয়ে থাকে বাতাসের মধ্যে। একটি পরিচিত গন্ধ এলেই সেই লুকানো স্মৃতিগুলো নিঃশব্দে ফিরে আসে।হয়তো এ কারণেই কিছু জায়গা আমরা শুধু “চিনি” না—আমরা তাদের অনুভব করি। চোখ বন্ধ করেও কখনো কখনো মনে হয়, “হ্যাঁ, আমি জানি আমি কোথায় আছি।” কারণ কোনো কোনো জায়গার ঠিকানা আমাদের মনে লেখা থাকে না; তার ঠিকানা লুকিয়ে থাকে আমাদের মস্তিষ্কের স্মৃতি আর পরিচিত গন্ধের গভীরে।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

